Search This Blog

Saturday, September 7, 2019

Historia amor invisible



সাইকেলের ক্রিং ক্রিং শব্দ শুনতেই দৌঁড়ে বাড়ির সদর দরজা খুলে দেয় ফাল্গুনী। তাকিয়ে দেখে সাদা পায়জামা আর বাদামি রঙের ফতুয়া পরহিত যুবক মাস্টারমশাই দাঁড়িয়ে আছেন।
‘ভেতরে আসুন।’
ফাল্গুনীর কথায় সম্মতি জানিয়ে ফাল্গুনীর পেছন পেছন বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন তাপস দাস।
এ বাড়িতে আজ তার প্রথম আসা। পাড়ার স্কুলটাতে কয়েক দিন হলো যোগদান করলেন। পাশের গ্রামেই তার বাড়ি৷ ফাল্গুনীকে পড়ানোর জন্য এখন থেকে তার এ বাড়িতেই আসা যাওয়া হবে রোজ। এমনটাই জানিয়েছেন ফাল্গুনীর বাবা নারায়ণ মুখার্জি।
গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবার হলেন নারায়ণ মুখার্জির পরিবার। তার শাসনেই চলে এ গ্রামের সকল কার্যক্রম। গ্রামের মানুষের প্রতি তার দয়া থাকলেও, নিজের সম্মানের প্রতি তিনি যথেষ্ট সতর্ক। সে বিষয়ে ছাড় দেন না কাউকে।
তাপস দাস ইতস্ততা অনুভব করছেন। দখিণ দিকের জানালা খোলা বাতাসও আসছে বেশ, তারপরেও বেশ ঘেমে চলছেন। ফাল্গুনী হাত পাখাটা হাতে নিয়ে বাতাস করতে লাগলে তাপস দাস আরও বেশি বিব্রতবোধ করলেন। হাত পাখাটা চেয়ে নিয়ে নিজেই বাতাস করতে লাগলেন।
‘আপনাকে কি মাস্টার বাবু ডাকবো?’
‘না! না! আমাকে তাপস দা ডাকলেই চলবে।’
মুচকি হেসে জবাব দিলো ফাল্গুনী, ‘আচ্ছা তাপস দা। কি পড়াবেন আজ তাহলে?’
‘তোমার কোন বই পড়তে ভালো লাগে?’
‘আমার তো রবীন্দ্রনাথ পড়তে ভালো লাগে।’
‘আর পাঠ্য বই?’
‘ওসবে আমায় তেমন টানে না। বাবার জোরেই পড়া লেখাটা চলছে।’
‘তোমার কোনো স্বপ্ন নেই?’
‘রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের নায়িকা হতে ইচ্ছে করে।’
‘আর?’
‘আর কোনো স্বপ্ন নেই।’
‘আজ তাহলে ইংরেজি দিয়ে শুরু হোক?’
‘আপনি বুঝি ইংরেজি পড়তে বেশি ভালো বাসেন?’
‘বাংলা, গনিতেও আমার যথেষ্ট জ্ঞান আছে। তবে ইংরেজিটা বেশি টানে।’
‘বৈশাখিও বলেছে আপনি স্কুলে কথায় কথায় ইংরেজি বলেন।’
‘ঠিক অতটা নয়। যতটা যাকে শেখানো প্রয়োজন ততটাই বলি।’
প্রতিদিন দুপুর বেলায় তাপস এ বাড়িতে আসে। ঘন্টা দেড়েক পড়িয়ে সাইকেল নিয়ে বাড়ি ফেরে। নারায়ণ মুখার্জি যদিও তাপসকে এ বাড়িতে থেকেই স্কুলে যাতায়াত করতে বলেছিলেন। কিন্তু তাপসই রাজি হয় নি৷ স্কুল থেকে ফিরে মায়ের মুখ খানা আর স্কুলে আসার আগে মায়ের মুখ খানা না দেখলে তার ভালো লাগে না।
বৈশাখি আর ফাল্গুনী উঠানের পেয়ারা গাছটা থেকে পেয়ারা পেড়ে খাচ্ছে ঠিক এমন সময় তাপস বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো। আজ আর সাইকেল আনে নি। হেঁটেই এসেছে।
বেশ তাড়াহুড়ো করেই পড়তে বসে গেলো ফাল্গুনী।
‘আজ সাইকেল আনেন নি কেন?’
‘গ্রামটা সুন্দর হেঁটে আসতেই ইচ্ছে হলো। তাই ভাবলাম….’
‘ওহ্! আচ্ছা আপনি কি কোলকাতায় পড়াশোনা করেছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘কোলকাতায় থেকে গেলেই পারতেন।’
‘নিজের আপন ভূমি ছেড়ে ওখানে খুব বেশি একটা শান্তি মেলে না।’
‘আমারতো বেশ লাগে।’
‘ওহ্’
প্রতিদিন কোনো না কোনো বিষয়ে কথোপকথনের পরই শুরু হয় পড়া লেখা। আস্তে আস্তে ফাল্গুনীও জানতে থাকে অজানা অনেক কথা। এবার শিখতে থাকে পাঠ্য বইয়ের পাতা।
ষোল বছরের ফাল্গুনীর শরীর জুড়ে কমতি নেই কোনো সৌন্দর্যের। কেবল মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে ষোড়শীর সৌন্দর্যের পানে। এই সৌন্দর্যের মোহে পড়েছে কত যুবক তার হিসেব নেই। তবে এখন আর কোনো যুবকের নজরে পড়লেও দীর্ঘস্থায়ী হয় না সে মোহ। চৌদ্দতে তার বিয়ে ঠিক হলো এক নাম করা ধনী ব্রাহ্মণ পরিবারের শিক্ষিত ছেলের সঙ্গে। বেশ সুদর্শন যুবক। দুই পরিবারের লোকজন মিলে বেশ আয়োজন করে ঢাকঢোল পিটিয়ে দাওয়াত দেয় বিশিষ্ট লোকজনদের।
কনে সেজে বসে আছে ফাল্গুনী। লজ্জায় তার সারা মুখ লাল হয়ে আছে। খিদে লাগলেও সে খিদে টের পায় না অপেক্ষায়। বিয়ের লগ্ন পেরিয়ে গেলো কিন্তু বর এলো না। এক সময় খবর এলো এ বিয়ে আর হচ্ছে না। ছেলে তার পছন্দের মেয়ের কাছে কলকাতায় চলে গেছে।
বিয়ে ভাঙ্গে ফাল্গুনীর, মন ভাঙ্গে বাড়ির সকলের। কয়েকদিন মন মরা হয়ে পড়ে থাকে বাড়ির এখানে ওখানে। তারপর নিজেই আবিষ্কার করে নিজেকে। ইচ্ছে জাগে ভালোবাসা জিনিসটাকে ছুঁয়ে দেখতে৷ কেমন হয় সে অনুভূতি, বেশ আগ্রহ হয় তার জানতে। যে ভালোবাসার টানে তার মত সুন্দরী মেয়েকে কেউ প্রত্যাখ্যান করে, সে ভালোবাসার টানটা একবার দেখার বেজায় স্বপ্ন জাগে মনে।
বাবাকে বলে পড়াশোনাটা শুরু করে। যদিও তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ নেই৷ সারাদিন সময় কাটানোর জন্য হলেও তো একটা ব্যস্ততা চাই। আর নারায়ণ মুখার্জিও এখন চান তার মেয়ে বড় কেউ হোক, নিজেই অর্জন করুক একলা চলার ক্ষমতা।
কয়েক দিনের ছুটি নিয়েছিলো তাপস। শহরের কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরলো সকালে। তারপর ফাল্গুনীর বাড়িতে ঠিক দুপুরের ঠিক সময়ে হাজির হয় তাপস। হাতে একটা রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস।
ফাল্গুনী জিজ্ঞেস করলো, ‘হঠাৎ রবীন্দ্রনাথ কেন তাপস দা?’
‘শহর থেকে নিয়ে এসেছি। তুমি তো রবীন্দ্রনাথ পড়তে ভালোবাসো।’
‘শেষের কবিতা। বাহ্! এই উপন্যাসটা আমার কাছে ছিলো না। আপনি বুঝলেন কি করে এটাই আমার দরকার?’
‘মনে হয়েছিলো, এটা নিলে ঠিক হবে।’
বইটা পেয়ে বেশ খুশি হয় ফাল্গুনী। মুগ্ধ হয়ে পড়তে থাকে বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠা। নিজেকে লাবণ্য মনে হতে লাগলো। অমিতের চরিত্রে না চাইতেও বারবার তাপস চলে আসে।
যত পড়ে তত অনুভবে ভেসে যায় তাপসকে নিয়ে। বই ছেড়ে উঠে পড়ে। ছাদের পশ্চিম কোণ ঘেঁষে শিউলি গাছ। বেলি গাছের লতাগুলোও বেয়ে উঠেছে ছাদে। কয়েকটা ফুল তুলে খোপাঁয় গুঁজে দেয়। তারপর গুনগুন করে গান গাইতে থাকে,
“মায়াবনো বিহারিণী হরিণী,
গহনো স্বপনো সঞ্চারিনি।
কেন তারে ধ’রি/বারে ক’রি
পন অকারণ…….”
ইদানীং দুপুর হতে যেন একটু বেশি সময় লাগে ফাল্গুনীর কাছে। ছাদে উঠে দাঁড়িয়ে রাস্তায় চোখ বুলায় কয়েকবার। তাপস এসেছে কিনা দেখার জন্য ছটফট করতে থাকে ফাল্গুনীর ভেতরটা৷
যখনই সাইকেলের ক্রিং ক্রিং শব্দ আসে, তখনই আনন্দে লাফিয়ে উঠে ফাল্গুনী। এই অনুভূতির নাম কি তার জানা নেই।
তাপসের পরিবার বলতে তাপসের মা আর ছোট বোন তৃণা দাস। ছোট বোনকে নিয়ে তার স্বপ্নের অন্ত নেই। সমাজের যে যাই বলুক না কেন বোনকে সে ডাক্তার বানাবে, এমনটাই পণ করেছে৷ তৃণারও লেখা পড়ায় ঢের আগ্রহ। পড়াশোনা ছাড়া তার কোনো জগৎ নেই বললেও চলে।
ফাল্গুনীর বড় বোনের বিয়ে হয়েছে কলকাতায়। বোনের বর পেশায় কলেজের অধ্যাপক। বেশ সুখেই আছেন তারা। ছেলে নেই বলে নারায়ণ মুখার্জির দুঃখবোধ না থাকলেও ফাল্গুনীর মায়ের যেন দুঃখ ঘোচেই না। তাপসকে তাই সে ভীষণ আদর করে। প্রায়ই যত্ন করে নিজ হাতে বেড়ে খাওয়ান। ফাল্গুনীর ছোট মাসি এ বাড়িতেই থাকেন। তাপসকে তিনি ভীষণ স্নেহ করেন। নিচু জাত বলে অবহেলা করেন না কখনও তারা।
তাপসের সারা মুখ জুড়ে মায়া। এই মায়াটাই সবাইকে বেশ টানে। তাছাড়া দেখতে শুনতেও কম নয়। তাপসের মা বলেন রাজপুত্তুর। রাজপ্রাসাদ না থাকলেও যা আছে তাতেই খুশি তাপস।
‘আপনি ইদানীং দেরি করে আসেন কেন?’
‘আমি তো যথা সময়েই উপস্থিত হই।’
‘এবার থেকে একটু তাড়াতাড়ি আসবেন।’
‘আচ্ছা আসবো।’
বইয়ের দিকে মনোযোগ নেই ফাল্গুনীর। পুরো মনোযোগ পড়ে আছে তাপসের পাণে। ইদানীং এই পরিবর্তনগুলো বেশ চোখে পড়ছে তাপসের। বুঝে উঠতে পারে না আসল ঘটনা।
‘কারো জন্য যদি সারা রাত ঘুম না হয়, বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে থাকে, সারাদিন আনমনে এটা ওটা ভাবতে থাকে, খাওয়ারও ইচ্ছে করেনা তাহলে তাকে কি বলা হয় তাপস দা বলতে পারেন?’
তাপস চুপ করে থাকে।
খানিক বাদে বলে ওঠে, ‘উপন্যাসেই এসব লেখা থাকে।’
‘যদি উপন্যাসের গন্ডি পেরিয়ে, সে ছটফটানি চলে আসে বাস্তবতায় তখন?’
‘ভেবে চিন্তে নিজেকেই জানতে হয়। নিজেকে নিজের থেকে কেউ ভালো বোঝে না।’
‘কিভাবে জানতে হয় বলবেন তাপস দা?’
‘সংশয় ঘুচাতে কখনও কখনও বিষয়ের কাছাকাছি পৌঁছেতে হয়। তবেই তো রহস্য উন্মোচন হয়।’
পড়ানো শেষ করে তাপস চলে যায়। চেয়ারেই বসে থাকে ফাল্গুনী। ভেবে পায় না কি করে পৌঁছাবে কাছাকাছি।
‘বাবা কিছু বলার ছিলো।’
মেয়ের শুকনে মুখটা দেখে মায়া হয় নারায়ণ মুখার্জির।
‘আয় মা, বোস এখানটায়। বল কি বলবি।’
‘পড়াশোনার চাপটা একটু বেশি যাচ্ছে। তুমি যদি তাপস দা’কে বলতে কয়েকটা দিন আমাদের বাড়িতে থাকতে।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। আমি ব্যবস্থা করছি।’
বাবার আশ্বাসে খুশি হয় ফাল্গুনী। কয়েকদিনের মধ্যেই তাপস এবাড়িতে ক্ষনস্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেলো। ফাল্গুনীর চোখে খেলা করছে অজানা এক অনুভূতি। এই রহস্য তাকে বের করতেই হবে।
সন্ধ্যা বেলায় হঠাৎ ঝড় শুরু হয়েছে। বাড়ির ভেতরের সব আলো নিভে যায় যায় অবস্থা। পর্দার কাপড় উড়িয়ে জানালা দিয়ে বেশ দমকা বাতাসের প্রবেশ শুরু হয়। জানালাগুলো আটকাতে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফাল্গুনী দৌড়ে আসে নিচে। দ্বিতল বাড়ির নিচ তলায় বেশ কয়েকটা কক্ষ। পূব পাশের কক্ষটাতেই তাপসের বসবাস। বাকি কক্ষের জানালাগুলো আটকানো শেষে পা বাড়ায় তাপসের কক্ষের দিকে। ঠিক তখনই তাপসের ঘর থেকে আচমকা এক দমকা বাতাস এসে নিভিয়ে দেয় হাতে থাকা মোমবাতিটা৷ বাহিরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। অনুমান অনুযায়ী পা বাড়াচ্ছে ফাল্গুনী। হঠাৎ ধাক্কা লাগে একটা শরীরের সঙ্গে।
তাপস ‘কে’, বলে চেচিয়ে উঠতেই ফাল্গুনী বললো, ‘আমি ফাল্গু।’
বাড়িতে সকলে ফাল্গু বলেই ডাকে ফাল্গুনীকে।
দিয়াশলাই খুঁজে মোমবাতিটা জ্বালায় তাপস। মোমবাতিটা এগিয়ে ধরতেই তাপসের চোখে পড়ে সৌন্দর্য গড়িয়ে পড়া ফাল্গুনীর মুখখানা। লালচে আলোয় সে সৌন্দর্য দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে।
মোম বাতিটা ফাল্গুনীর হাতে দেয় তাপস। তারপর নিজের মোমবাতি খুঁজতে গিয়ে দেখে একটা মোমবাতিও নেই। মুখোমুখি বসে আছে দু’জন। মোমবাতিটা টেবিলের উপর রাখতে যাবে এমন সময় গর্জিয়ে এক বিদ্যুৎ চমকে উঠলো।
ফাল্গুনীর হাত থেকে মোমবাতিটা ফ্লোরে পড়ে নিভে গেলো। তোড়জোড় করে আবারও এক গর্জন। শক্ত করে চেপে ধরলো পাশে থাকা তাপসের হাতটা।
তাপস ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে না। হঠাৎ হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানো আলো জানালার ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করছে। সে আলোয় ফাল্গুনীর ভয় পাওয়া মুখটা আবছা দেখা যাচ্ছে। মায়া জন্মাতে লাগলো তাপসের।
বৃষ্টি কমলে হাতটা ছেড়ে দেয় ফাল্গুনী। তাপসকে নিজের ঘর থেকে কয়েকটা নতুন মোমবাতি দিয়ে পাঠায় বৈশাখির কাছে। রাতের খাবার শেষে আজ আর ফাল্গুনীর ঘুমই আসে না। বারবার তাপসের হাত ধরে বসে থাকার কথা মনে পড়তে থাকে। লজ্জায় পরেরদিন এড়িয়ে চলে তাপসকে।
ফাল্গুনী ভীষণ ভালো রবীন্দ্র সংগীত গায়। প্রায় ভোরেই হারমোনিয়ামে সুর তোলে, গলা ছেড়ে গান গায়। ছাদে হাঁটতে হাঁটতেও গুনগুন করে গান গায়। ইদানীং একটু বেশি বেশিই গানে মনোযোগ দেয় ফাল্গুনী। প্রায় গেয়ে ওঠে,
‘আমারও পরানে যাহা চায়,
তুমি তাই-
তুমি তাই গো…..’
এই কয়েকদিনেই তাপসও টের পায় ফাল্গুনীর প্রতি তার বিশেষ টানটা। কিন্তু নারায়ণ মুখার্জির কথা মনে পড়তেই ভুলে যায় সব। নিজের জাত রেখে অন্য জাতের সাথে ভালোবেসে ঘর ছেড়েছিলো তার ছোট বোন। সেই থেকে তিনি তাঁর ছোট বোনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
ফাল্গুনীর ছোট মাসিও ভালোবাসতেন অন্য জাতের এক ছেলেকে। নারায়ণ মুখার্জির কানে খবর এলে গ্রাম থেকে বের করে দেন সপরিবারে তাদেরকে। গ্রাম ছেড়ে চলে যায় ছোট মাসির ভালোবাসার মানুষ। নারায়ণ মুখার্জির কড়া নির্দেশ অমান্য করার সাহস তার হয় নি। ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করতে না পারার শোকে আর কখনও বিয়ে করেন নি তিনি।
সবাইকে বলে কয়ে এবার বাড়ির দিকে যাওয়ার অনুমতি চায় তাপস। সবাই অমত করলেও একসময় রাজি হয়।
‘তাপস দা আপনি আরও কয়েকদিন আমাদের বাড়িতে থাকুন না দয়া করে।’
ফাল্গুনীর কথাটা রাখতে গেলে ভেতরে আরও মায়া জন্মে যাওয়ার ভয় থাকে। তার থেকে দিনে দেড় ঘন্টা বরাদ্দ থাকাই ঢের ভালো।
ফাল্গুনীর মুখ মলিনতায় ছেয়ে যায়। দুপুরের এই দেড় ঘন্টা তার জন্য খুব নগন্য মনে হতে থাকে। ভেতরের যন্ত্রণার কথা একসময় জানায় ছোট মাসিকে।
মাসি ভীত স্বরে বলে, ‘সর্বনাশ করেছিস ফাল্গু! তুই তো ভালোবেসে ফেলেছিস তাপস কে।’
ফাল্গুনী অবাক চোখে চেয়ে থাকে। তাঁর অবিশ্বাস্য লাগে, সে কাউকে ভালোবেসেছে। মুখ জুড়ে আনন্দের হাসি ফোটে।
ছোট মাসি ধাক্কা দেয় ফাল্গুনীকে, ‘ওই ফাল্গু! হাসছিস কেনো? খবরদার তুই কিন্তু মনের ভুলেও এই কথা মুখে উচ্চারণ করিস না। জামাইবাবু শুনলে খবর করে ছাড়বে তাপসের।’
ফাল্গুনী পাত্তা দেয় না সে কথা।
হেসে উঠে বলে, ‘মাসি! সত্যিই এটাকেই ভালোবাসা বলে? এই জন্যই মানুষ ঘর ছাড়ে, পালায় বিয়ের আসর থেকে, উপেক্ষা করে সব আর অপেক্ষাও করে তোমারই মত!’
ছোট মাসি চুপ করে থাকে। ভেতরে ভেতরে সে এখনও অপেক্ষা করে তার ভালোবাসার মানুষের জন্য। সাহসের অভাবেই চাপা দেয় সব অনুভূতি। লুকিয়ে রাখে ভেতরটাতে সব মায়া, যন্ত্রণা আর ভালোবাসা ।
তাপসকে ভালেবাসার কথা বলার সাহস নেই ফাল্গুনীর। ভয় হয়, তার মত তাপসও যদি অন্য কাউকে মন দিয়ে বসে থাকে তখন কি হবে!
কিংবা তাপস যদি তার মত বিয়ে ভাঙ্গা মেয়েকে ভালোবাসতে না চায়!
এমন অনেক প্রশ্ন ভীড় জমায় মস্তিষ্কে। কিন্তু দিনদিন অস্থিরতা বেড়ে চলছে এতে। অনেক ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে চিঠি লিখতে বসে যায়।
আজ যেন দুপুর হচ্ছেই না।
পড়া শেষে তাপসের আনা বইয়ের মাঝে চিঠিটা পুরে দেয় গোপনে।
বাড়ি ফিরে সন্ধ্যায় বই খুলতেই তাপসের চোখে পড়ে চিরকুট। আবেগ আর মায়া জড়িয়ে ভালোবাসা ঢেলে লেখা এই চিরকুট’টা তাপসের হৃদয়ে স্থান পেলেও প্রকাশ করে নি তাপস সে কথা। এক ঝামেলার পরে নতুন করে আরও একটা ঝামেলা আনতে চায় না ফাল্গুনীর জীবনে।
পরদিন পড়াতে গেলে তাপস এমন ভাব দেখায় যেন সে কোনো চিরকুটই পায় নি। ফাল্গুনী বুঝে উঠতে পারে না ঘটনা৷ বারবার ভাবতে থাকে চিরকুট তো ঠিকমতোই দিয়েছিলো বইয়ের ফাঁকে।
পরদিন আবার চিরকুট লেখে ফাল্গুনী। কিন্তু প্রত্যুত্তরে মেলে না কিছুই। টানা সতেরো দিন চিরকুট লিখে যায় সে। একসময় বুঝতে পারে ইচ্ছে করেই অগ্রাহ্য করছে তাপস।
বাড়ির সকলে আজ নিমন্ত্রণে গেছে। বাড়িতে কেবল ফাল্গুনী একা। বিকেলেই ফিরবে সকলে। নানা অজুহাত দেখিয়ে রয়ে যায় ফাল্গুনী।
তাপস এসে বসতেই জিজ্ঞেস করলো, ‘বাড়ির সকলে কেথায়?’
‘নিমন্ত্রণে গেছেন। বিকেলে চলে আসবে।’
‘আজ তা হলে আমি আসি। কাল এসে বেশি সময় পড়িয়ে যাবো।’
বলেই উঠে দাঁড়ায় তাপস। ফাল্গুনী হনহন করে দরজার সিটকানি লাগিয়ে তাপসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘চিঠির উত্তর দেন নি কেনো?’
তাপস চুপ করে থাকে।
‘আমার বিয়ে ভেঙ্গেছে বলে বিয়ে করা যাবে না নাকি অন্য কাউকে আপনি ভালোবাসেন?’
‘এমন কিছুই না।’
‘তবে কি সেটা আমি জানতে চাই।’
তাপস চোখ তুলে তাকায়। রাগত্ব স্বরে জবাব দেয়, ‘আমাদের জাত আলাদা। তোমার সাথে আমার মেলে না। মেলানো সম্ভব নয়। এসব কথা তুমি ভুলে যাও। আর কখনও চিঠি লিখবে না।’
বলেই চলে যেতে চায় তাপস। আচমকা সেদিনের ঝড়ের রাত্রিরের মত আবার শক্ত করে তাপসের হাতটা ধরে বসে ফাল্গুনী।
‘আপনি কি আমায় ভালোবাসেন না?’
তাপস চুপ থাকে।
ফাল্গুনীর চোখ বেয়ে জল নামে।
আকুতি করে আবার জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কি সত্যিই আমায় ভালেবাসেন না?’
তাপস এবার আর নিজেকে আটকাতে পারেনা। দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে ফাল্গুনীর চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়, ‘আমি ভালোবাসি।’
ডুকরে কেঁদে উঠে ফাল্গুনী।
‘আমাকে নিয়ে চলুন এখান থেকে। আমি মুক্তি চাই এই জাতে জাতে পার্থক্য থেকে।’
‘লাবণ্য পায় নি অমিতকে, তুমিও পাবে না আমায়। বিরহেও ভালেবাসা বেঁচে থাকে। থাকুক এভাবে।’ বলেই হন্তদন্ত হয়ে চলে যায় তাপস।
চিৎকার করে কেঁদে ওঠে ফাল্গুনী।
এখন আর আসে না তাপস এ বাড়ি। গুনগুন করে গান গেয়ে উঠে না ফাল্গুনী। রাতে বালিশ ভেজায়, দিন হলে স্পষ্ট হয় চোখের নিচের কালো দাগটা।
‘মাসি তুমি চলে গেলে না কেন তার সঙ্গে?’
‘যেতে চেয়েছিলুম রে ভেতরে, বাহিরে সাহস করে কুলোতে পারলাম না৷ এমন পুড়ে মরতে হবে জানলে সেদিন রাতেই চলে যেতাম।’
‘কোন রাতে?’
‘যে রাতে সিঁদুর পরানোর কথা ছিলো।’
বলতেই ভেতরটা মোচড় দেয় তার। চুপ করে থাকে।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ফাল্গুনী।
বৈশাখিকে দিয়ে জরুরি খবর পাঠায় তাপসের কাছে। ফাল্গুনী খুব ভালো করেই জানে তাপস আসবে।
বাড়ির সকলে ফাল্গুনীর বড় পিসির বাড়ি গিয়েছে নিমন্ত্রণে। আজও রয়ে গেলো ফাল্গুনী একাই। রাতেই ফেরার কথা সবার।
ঘোর অন্ধকারে বাহির ছেয়ে আছে। আকাশও বেজায় মেঘলা। ভাপসা গরম পড়েছে দুপুর থেকে। তাপস এসে দরজার কড়া নাড়তেই দরজা খোলে ফাল্গুনী।
লাল শাড়ী পড়েছে সে, দু’হাতে লাল রেশমী চুড়ি, আলতা দিয়েছে সুন্দর করে, কালো দীঘল চুলগুলো খোলাই রইলো।
চোখ ফিরিয়ে নিয়ে তাপস জিজ্ঞেস করে, ‘সকলে কোথায়?’
উত্তর দেয় না ফাল্গুনী।
তাপসের হাতে সিঁদুরের কৌটা ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘পড়িয়ে দাও। সংসার না হোক, একসঙ্গে থাকা না হোক, একটা শক্ত স্বীকৃতি থাকুক। আমি আমার ভালোবাসার শক্ত স্মৃতি চাই।’
তাপস উপেক্ষা করে চলে যেতে চাইলো। বাহিরে মেঘ গর্জন করে উঠলো। পথ আটকালো ফাল্গুনী। বৃষ্টি নামলো ঝমঝমিয়ে। আজ রাতে আর এ বৃষ্টি থামবে বলে মনে হয় না।
জানালাগুলো সব খোলা। জানালা দিয়ে এক পশলা বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিলো জানালার এপাশ। হঠাৎ আবার গর্জন করে মেঘ ডাকলো সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকানো। জাপটে ধরলো তাপসকে ফাল্গুনী। ছাড়িয়ে নেওয়া অসম্ভব তাকে। তাপস বুকের মাঝেই আগলে রাখলো ফাল্গুনীকে। তাপসের বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দনের মাত্রা বাড়তে লাগলো। ফাল্গুনী আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো।
‘তাপস দা?’
‘বলো’
‘এই রাত্রিরটা তোমার আমার জন্যই। ঈশ্বর চাইছেন বলেই আজ বরষা নামলো। আমায় ফিরিয়ে দিও না তুমি৷ সেদিন মোমবাতিটা পড়ে গিয়েছিলো, সিঁদুরের কৌটা’টা কিন্তু হাতেই আছে দেখো। তাপস দা আমি তোমার কাছে কেবলই স্বীকৃতি চাই। আমায় হতাশায় ডুবিও না।’
গড়গড় করে পানি ঝরছে চোখ থেকে। তাপসের চোখ ছলছলিয়ে উঠলো। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে। এ বৃষ্টিতে কেউ ফিরতে পারবে বলে মনে হয় না। সিঁদুরের কৌটা’টা হাতে নিয়ে পরিয়ে দিলো খোলা চুলের সিঁথিতে।
জাপটে ধরলো ফাল্গুনী তাপসকে।
চোখের জল আলতায় মিশলো, আলতা রাঙা হাত থেকে গড়াচ্ছে রাঙা ফোটা।
তারপর ঘোর অন্ধকার। মোমবাতি ফুরিয়ে নিভে গেলো। সে অন্ধকারে মিশে গেলো তারা দু’জন। মনের ভালোবাসা এবার শরীর জুড়ে উথলে উঠছে।
স্বীকৃতির সঙ্গে চিহ্ন জন্মাচ্ছে ভালোবাসার। স্মৃতিতে লেগে থাকবে এ ভালোবাসার গভীরতা। ভালো থাকার পুরোপুরি অধিকার আছে এখন দু’জনের।
আজ আর ভয় নেই যেনো কোনো কিছুতে। ভালোবাসা আটকে রাখার জিনিস নয়। ভালোবাসার স্থান মনে, মন সে তো ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। অদৃশ্য এই ভালোবাসাকে জাতে আঁটকাবে কি করে!

No comments:

Post a Comment

Pages

Featured post

গল্প -সহযাত্রী

  ট্রেনটা চলতে চলতে থেমে গেল একটা ক্যাঁচ শব্দ তুলে। বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির কারণে বা লাইন বদলের দরুন থেমে গেছে দূরপাল্লার একটা ট্...