Search This Blog

Wednesday, October 21, 2020

গল্প -সহযাত্রী

by on October 21, 2020

 


ট্রেনটা চলতে চলতে থেমে গেল একটা ক্যাঁচ শব্দ তুলে। বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির কারণে বা লাইন বদলের দরুন থেমে গেছে দূরপাল্লার একটা ট্রেন। এসি কামরার ভেতরে মর্গের নিস্তব্ধতা। সারি সারি বাঙ্কের ওপর সাদা চাদর টেনে শুয়ে আছে যাত্রীরা। মাঝে মাঝে কারো কারো সুতীব্র নাসিকা গর্জন কামরাটিতে প্রাণের স্পন্দনের জানান দিচ্ছে। কয়েকটি পায়ের শব্দে নিজের চাদর সরিয়ে বিপ্রদাস বাবু দেখলেন তিনটি অল্প বয়সী ছেলে ব্যাগপত্র নিয়ে গুছিয়ে বসেছে তার নিচের বাঙ্কে । একজন বাইরে তাকিয়ে বলল, “বৃষ্টিটা জোর শুরু হলো রে বিকাশ। চাকা কখন গড়াবে কে জানে?” আরেকটি ছেলে ব্যাগের ভেতর কিছু একটা হাতড়াচ্ছিলো, সেই কাজটি অব্যাহত রেখেই বলল, “যখন গড়াবে তখন গড়াবে। আমাদের তো আর পিছুটান নেই। স্টেশনে নামতে ভোর রাত হতো। তার চেয়ে সকাল সকাল পৌঁছনোই ভালো। গাড়ি ঘোড়ার দেখা পাবো।” আরেকটি ছেলে নিজের ব্যাগ থেকে একটি ফ্লাস্ক বের করে কাগজের কাপে ঢালতে ঢালতে বলল, “এরকম ওয়েদারে কিন্তু ভূতের গল্প ভালো জমবে। কি বলিস বিকাশ?” দ্বিতীয় ছেলেটি প্রথম ছেলেটির দিকে তাকিয়ে ফিচেল হাসি হাসলো। বিপ্রদাস বাবু বুঝলেন এই ছেলেটিই বিকাশ। হাবভাব দেখে মনে হয় দলের লিডার। প্রথম ছেলেটি ভীষণ একটা তেড়ে উঠে বলল, “এই, এই তোরা এসব করলে কিন্তু আমি এখুনি ট্রেন থেকে নেমে যাবো। তোরা খুব ভালো করেই জানিস আমি এগুলো পছন্দ করি না।” বিকাশ ও তৃতীয় ছেলেটি দুজন দুজনকে ঠ্যালাঠেলি করে হেসে উঠল। তৃতীয় ছেলেটি বলে উঠল, “অবিনাশ তোকে তো এই জন্যই এনেছি।” প্রথম ছেলেটি বলল, “সত্য খুব খারাপ হবে কিন্তু।”

বিপ্রদাস বাবু এখন তিনটি ছেলেরই নাম জেনে গেছেন। প্রথম ছেলেটির নাম অবিনাশ, দ্বিতীয় জন বিকাশ ও তৃতীয় ছেলেটির নাম সত্য। উপরতলার বাংক থেকে তিনি মুচকি মুচকি হাসি নিয়ে তিনজনকে নিরীক্ষণ করছিলেন। হঠাৎ ওদের কথার মাঝে বলে উঠলেন, “ভূতে বুঝি ভাইটির খুব ভয়?” ওরা তিনজন চকিতে ওপরে তাকালো। বিপ্রদাস বাবুর চেহারা দেখে বিকাশ ফিক করে হেসে ফেলল। তার মাথায় চাপানো একটি মাঙ্কিটুপি। সেই টুপির ফাঁক গলে উঁকি মারছে তার কাঁচা পাকা দাড়ি গোঁফ ও ভ্রূ আর মোটা ফ্রেমের কালো চশমা। গায়ে ঘিয়ে রঙের চাদর। তার নিচে দেখা যাচ্ছে হলুদ খয়েরি চেক শার্ট আর ঢলা পাজামা। বিপ্রদাস বিকাশের হাসি অবজ্ঞা করে তিনতলার বাঙ্ক থেকে নেমে এলেন। সত্যের দিকে তাকিয়ে বললেন, “হবে নাকি এক কাপ?” সত্য বিপ্রদাসের দিকে এককাপ চা এগিয়ে দিতেই তিনি তৃপ্তি ভরে একটা চুমুক দিয়ে বলতে শুরু করলেন, “তোমরা হয়তো ভাবছো কোত্থেকে এই বুড়ো শিঙ ভেঙে বাছুরের দলে এসে জুটল। তাই তো, নাকি?” এখানে বলে রাখা দরকার বিপ্রদাস বাবুর বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। আর তিনজন যুবক বাইশ তেইশ হবে। বিপ্রদাসের কথায় সত্য বিনয়ভরে মাথা নেড়ে বলল, “না না। তা কেন ভাববো। আমরা তো সহযাত্রী।” সত্যর কথায় বিপ্রদাস বেশ পুলকিত হয়ে আরো গুছিয়ে বসলেন সিটের ওপর। বললেন, “হ্যাঁ তা ঠিক বলেছ। সহযাত্রী। মানে একই পথের যাত্রী। আমি নামবো মোঘলসরাই। তোমরা?” বিকাশ বলল, “ইচ্ছে আছে জববলপুর। তবে তার আগে যদি কোন জায়গা দেখে পছন্দ হয় নেমে যাবো।” বিপ্রদাস এই কথায় আরো পুলকিত হয়ে বললেন, “বাহ, বাহ, এই তো, এই তো… ইয়াং ব্লাডের মতো কথা। ওরকম নির্দিষ্ট জায়গা বেছে আডভেঞ্চার হয় নাকি! নিরুদ্দেশে গিয়েই তো জীবনকে এক্সপ্লোর করা যায়। গুড ভেরি গুড।” যুবকরা সমীহ সূচক হেসে নিজের নিজের ব্যাগ থেকে পাম্প বালিশ বের করে ফোলাতে শুরু করলো। বিপ্রদাস চারিদিক দেখে চায়ে শেষ চুমুকটা দিয়ে সিটের নিচে কাপটা চালান করে বললেন, “তা ভায়ারা শুয়ে পরবে নাকি?” অবিনাশ বলল, “হ্যাঁ, রাত তো হলো আর আপনিও তো ঘুমাচ্ছিলেন।” বিপ্রদাস বুঝলেন তার উপস্থিতি যুবকরা খুব একটা পছন্দ করছে না। তবুও একটা নট নড়নচরন ভাব দেখিয়ে বললেন, “হ্যাঁ তা আমার ট্রেনে চড়লে বেশ ভালোই ঘুম হয়। তবে কিনা ওই ভূত শব্দটা শুনলেই আমার মস্তিষ্কের মধ্যে কেমন একটা উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। আসলে অনেক ছোটবেলা থেকে। এই ধরো তোমাদের থেকেও ছোট বয়স থেকে এডভেঞ্চারের নেশায় পেয়ে বসেছিল আমায়। তখন থেকে ঘুরে চলেছি। ভারতবর্ষের খুব কম জায়গাই অবশিষ্ট আছে যা আমি এই চর্মচক্ষে দেখিনি। কতো অভিজ্ঞতাই না হয়েছে। বন্যজন্তু, যুদ্ধ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, ভূমিকম্প, সুনামি। মহাপ্রলয়েও আমি বাড়ীতে মুখ লুকিয়ে বসে থাকিনি। তার মধ্যে এই ভূত বাবাজিও আছেন। তবে অন্যান্যদের তুলনায় তার ব্যাপারে আমার আগ্রহটা একটু বেশি।” অবিনাশ বিরক্ত হয়ে বলল, “কেন আপনার সাথে কি তার অহরহ দেখা হয় নাকি?” বিপ্রদাস মুখ কুঁচকে বললেন, “ওটাই তো মুশকিল হে ভায়া। যতবার তার দেখা পেতে গেছি সে আমার সাথে রীতিমতো লুকোচুরি খেলেছে। দেখেছি কিন্তু ধরতে পারিনি।” বিকাশ এবার গুছিয়ে বসে বলল, “বাহ বেশ ইন্টারেস্টিং তো! আপনি বুঝি ওই ভূতের কথা শুনে নেমে এলেন।” বিপ্রদাস মুচকি হেসে বললেন, “একদম ঠিক। এই যে অবিনাশ ভূতের কথায় ভয় পায়। তা একেবারেই অমূলক। ভূত পুত আছে কি নেই সে তর্কে যাবো না। তবে থাকলেও তাকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমি নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বলতে পারি।” বিকাশ এবার উৎসাহ নিয়ে বলল, “তাই নাকি? তাহলে বলুন আপনার একখানা কীর্তির কথা।” বিপ্রদাস যেন এই মুহূর্তটারই অপেক্ষা করছিলেন। বেশ উৎসাহ নিয়ে বলতে শুরু করলেন, “শোনো হে অবিনাশ ভায়া। প্রথমেই বলেছি আমি নানান জায়গায় ঘুরে বেড়াই। বিয়ে থা করিনি ওই ঘোরার জন্য। বিয়ে মানেই সংসার, সংসার মানেই খাঁচা। আমি বাপু খাঁচায় থাকার জন্য জন্মায়নি। তা এরকমই একদিন , তা প্রায় বছর চারেক আগে, ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে গেছি আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের রঙ্গতে। আন্দামান বেড়াতে গেলে খুব কম ট্যুরিস্টই রঙ্গত, ডিগলিপুর ঘুরতে আসে। আসলে ওখানে দর্শনীয় তেমন কিছু নেই। কিন্তু আমি তো শুধু ছবি তোলার জন্য বা চোখের দেখা দেখার জন্য ওখানে যাইনি। আমি গেছি জায়গাটার জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি বুঝতে। তা বি.ট্যাং পেরিয়ে। জারওয়াদের শান্তি ও জীবনযাত্রাতে কোনোরকম ব্যাঘাত না ঘটিয়ে দুটো ফেরি পাল্টে এসে পৌঁছলাম রঙ্গত। ফেরিঘাট থেকে কয়েক পা হাঁটলেই সারি সারি হোটেল ও থাকা-খাওয়ার জায়গা। জমজমাট এলাকা। তবে আমার জমজমাট নয়, নিরীবিলি জায়গা পছন্দ। তাই আরো কিছুক্ষন হাঁটা লাগিয়ে এসে পৌঁছলাম ফেরিঘাট থেকে ঘন্টাখানেক দূরের একটি জায়গায়। সেখানে প্রচুর খাবারের দোকান। একটু বেশি টাকা দিলে থাকার ব্যবস্থাও করে দেয় ওরাই। ওদের সকলের বাড়িতেই একটা করে বাড়তি ঘর থাকে। ভাবতে পারবে না ওরকম দেশী মুরগির ঝোল আমি আজ পর্যন্ত কোথাও খাইনি। এখনো যেন মুখে লেগে আছে। যাহোক, সেখানেই আমার পরিচয় ঘটলো কৌশিকের সাথে। কৌশিক বটব্যাল। তখন তার বয়স এই তোমাদের মতোই, কি একটু বেশি। কল্যাণীর বাসিন্দা। সেও আমার মতোই ভবঘুরে। তবে তার নেশা একটু আলাদা। সে ভারতবর্ষের চার্চ ও মিশনারি ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছিল। কোথায় যায়নি? গোয়া থেকে কলকাতা। উত্তর থেকে দক্ষিণ সারা ভারতের নতুন পুরোনো চার্চের ইতিহাস, গঠনশৈলী তার নখ দর্পণে। এখন মূল ভূখন্ড ছেড়ে এসেছেন দ্বীপপুঞ্জে ইংরেজ মিশনারিজের ইতিহাস ও প্রভাব জানতে।
এটা তো সর্বজনবিদিত যে রাজ্যের বাইরে বাঙালি দেখলেই, বাঙালি জাতির বাঙালিয়ানা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তবে আন্দামানে হিন্দিভাষী যেমন আছে, বাঙালিও কিন্তু সমান পরিমাণে বাস করে। দেশভাগের পরে বাংলাদেশ থেকে একটা বিরাট অংশের মানুষ চলে এসেছিল বা তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল এই আন্দামানে। তাই ওখানে গিয়ে কোনো বাঙালির এক মুহূর্তের জন্যও মনে হবে না যে সে তার রাজ্যের বাইরে এসেছে। আমারও বাঙালিয়ানা বেড়ে গিয়ে কৌশিকের সাথে আলাপচারিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আশা করি তারও সেরকম অনুভূতি হয়েছিল। নাহলে আমি তার সাথে ভিড়ে যাওয়ার প্রস্তাব পারতে সে তা নাকচ করেনি।

এই কৌশিকের কাছে জানলাম রঙ্গত থেকে প্রায় আট ঘন্টা দূরত্বে আছে একটা দ্বীপ― রস এন্ড স্মিথ আইল্যান্ড। এই দ্বীপে প্রায় দেড়শ বছর পুরোনো একটি চার্চ রয়েছে। বহু বছর তা পরিত্যক্ত। তাছাড়া সুনামির আঘাতেও তার বেশ কিছু অংশ ভগ্নপ্রাপ্ত। এই চার্চটি তার কারুকার্য ও বিদেশি উপকরণের জন্য একসময় বিখ্যাত ছিল। তবে সেটি কুখ্যাতও বটে। কৌশিককে জিজ্ঞাসা করলাম, “কুখ্যাত কেন?” বলল, “বিশেষ কিছু জানি না। তবে অনেকেই নাকি ওখানে ভূত দেখেছে। কি ভূত, কেমন ভূত সেই স্পষ্ট বিবরণ কিন্তু কারুর কাছেই পাইনি।” প্রশ্ন করলাম, “কোনো মৃত্যুর খবর আছে?” কৌশিক উত্তর দিল, “নাঃ, তাও নেই। তবে ওখান থেকে সন্ধ্যের আগেই চলে আসার এক অলিখিত নিয়ম চালু আছে।” তারপর আমার দিকে উৎসাহী দৃষ্টি হেনে বলল, “যাবেন নাকি একবার?” যেমন কথা, তেমন কাজ। পরের দিনই ব্যাগ-পত্র গুছিয়ে রওনা দিলাম। রঙ্গত থেকে এলাম ডিগলিপুর। সেখানে বিশ্রাম নিয়ে, খাওয়া-দাওয়া করে, আবার রওনা দিলাম। ফেরি পেরিয়ে আরো কয়েক মাইল বাস যাত্রার পর আরেকটি ফেরিঘাটে একটি স্পিডবোট ভাড়া করলাম। তখন প্রায় দুপুর দুটো। বোটের চালক টুথপিক দিয়ে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে নিস্পৃহভাবে বলল, “যেতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট, আসতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। আইল্যান্ডে থাকতে পারবেন আধ ঘন্টা। চারটের পরে আর ওদিকে কোনো বোট এলাউড নয় স্যার।” আমরা পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। আমাদের তো উদ্দেশ্য অন্য। বললাম, “তা ওখানে হোটেল আছে? থাকা-খাওয়ার জায়গা?” লোকটা এবার আমাদের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। মুখ দেখে বুঝলাম সে আমাদের কথা শুনে আকাশ থেকে পরল। মনে মনে ভাবলাম, যাক এবার একটু নাহয় সম্মান দিয়ে কথা বলবে। কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে নিজেকে সামলে বলল, “হ্যাঁ আছে। কিন্তু একটু ভেতরে, বস্তির দিকে হেঁটে যেতে হবে। ট্যুরিস্ট পার্টি তো সকালেই আসে। তাই বস্তির কেউই আর বিচে থাকে না সন্ধ্যেবেলা।” আমরা তার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলাম যে সে যেন বিচে নেমেই আমাদের কোনো একজন বাসিন্দার সাথে আলাপ করিয়ে দেয়। মনমতো রফা হলেই তার কাজ শেষ। আবার পরেরদিন সকালে সে যেন আমাদের আবার সেই ফেরিঘাটে পৌঁছে দেয়। চালক রাজি হলো। বদলে টাকাটা একটু বেশিই চাইল। সে যাই হোক, আমি আর কৌশিক এমন সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে মহানন্দে চড়ে বসলাম বোটে। নীল, সবুজ কোরাল সমন্বিত সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে খেলা করতে করতে সে বোট এসে পৌছল রস এন্ড স্মিথ আইল্যান্ড। দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন কোনো চিত্রকর তার ক্যানভাসে আইল্যান্ডটা খুব যত্ন নিয়ে এঁকেছেন। এখানে বালির রং। আমাদের দীঘা-পুরীর হলুদ ঘোলাটে বালি না। অতো স্বচ্ছ জল আমি আগে দেখিনি। সমুদ্রে পা ডোবালে পা স্পষ্ট দেখা যায়। জামাকাপড়ে বালির চিহ্ন থাকে না। কলকাতার পানীয় জলও অতো স্বচ্ছ নয়।
আইল্যান্ডে নৌকা ভেড়ানোর কোন ঘাট নেই। তাই মোটামুটি একটা চর পেয়েই সেখানে বোট থামিয়ে দিল চালক। আমরা হাঁটু অবধি প্যান্ট গুটিয়ে নেমে পরলাম জলে। বিচের ধারে সার সার খাবারের দোকান। টেবিল চেয়ার সাজানো। নানা রকম মাছ, কাঁকড়া ভাজা হচ্ছে। ভাতের পদও পাওয়া যাচ্ছে, মেনুচার্ট টাঙিয়ে। বিষ্ণু, আমাদের বোট চালক এক দোকানির কানের কাছে ফিসফিস করে কিছু বলল। সেই লোকটি আবার আমাদের দিকে অবাক হয়ে তাকালো। আমরা বুঝলাম আমাদের নিয়েই কথা হচ্ছে। তাই বিন্দুমাত্র দেরি না করে এগিয়ে গেলাম তার দিকে। সে অবাক চোখে বলল, “আপনারা আজ এখানে থাকবেন?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, কোনো অসুবিধা আছে নাকি?” সে ইতস্তত ভাবে বলল, “ না তেমন কোনো অসুবিধা নেই। তবে একটাই ঘর পাবেন কিন্তু।” আমি কৌশিকের দিকে তাকালাম। সে মাথা নেড়ে বলল, “কোনো প্রবলেম নেই বিপ্রদা।” লোকটির সাথে থাকা খাওয়ার রফা করে আমরা ভাত-ডাল-সবজি আর সুরমাই মাছের ঝাল নিয়ে খেতে বসলাম। সুরমাই আন্দামানের জাতীয় মাছ। তারপর সেই দোকানির কাছেই চার্চে যাওয়ার পথনির্দেশ জেনে রওনা হলাম। তবে দোকানি বারবার সতর্ক করে দিল সাড়ে চারটে থেকে পাঁচটার মধ্যে যেন আমরা অতিঅবশ্যই বিচে ফিরে আসি।

চার্চটা একটা টিলার ওপর। সমুদ্র সৈকত থেকে বেশ খানিকটা দূরে। তবে চারিদিক বেশ সাজানো গোছানো। যত ওপরে উঠতে শুরু করলাম, গাছ গাছালির পরিমাণ বাড়তে শুরু করলো। ক্রমে তা ঘন থেকে ঘনতর হয়ে উঠলো। আমি আর কৌশিক বেশ খানিকটা ওপরে উঠে এসেছি। পথে দেখা মিলল দুটি হরিণের। নারী ও পুরুষ। শিঙ দেখে হরিণদের আলাদা ভাবে চেনা যায়। যার শিঙ আছে সে পুরুষ, যার শিঙ নেই সে নারী। পশুদের জগত মানুষদের তুলনায় আলাদা। মনুষ্য সমাজে মহিলারা সুন্দরী আর পশু সমাজে পুরুষরা। চলতে চলতে চোখে পড়ল ইংরেজ কোয়ার্টার, অফিস, ক্লাব, কনফারেন্স হল, রিক্রিয়েশন ক্লাব, স্কুল বিল্ডিং আরো কতো কি! কিন্তু সবই পরিত্যক্ত ও ভাঙাচোরা। একসময় এগুলোই জমজমাট ছিল। গমগম করতো মানুষের হাসির হিল্লোলে। সবকটা বাড়ির দেওয়ালের গায়ে জমেছে শ্যাওলা, আগাছার জঙ্গল। তবে জায়গাটা বেশ পরিষ্কার ও সুসজ্জিত। অবহেলার চিহ্ন নেই। এই জরাজীর্ণতাই যেন স্থানটিকে আরো মহিমান্বিত করে তুলেছে।

হাঁটতে হাঁটতে আরো কিছুটা যাওয়ার পরে চোখে পড়ল চার্চের ত্রিভুজাকৃতি চূড়া। একইভাবে শ্যাওলা আর আগাছায় ভরে গেছে। আরেকটু এগোতে কানে এলো সমুদ্রের গর্জন। বুঝলাম আমরা দ্বীপের একেবারে শেষের দিকে এসে পড়েছি। এবার শুরু হলো উৎরাই। আর এই সময়েই গোটা চার্চটার প্রতিচ্ছবি ধরা দিল আমাদের কাছে। আমরা পা চালাতে শুরু করলাম। কৌশিকের উৎসাহ স্বাভাবিকভাবেই আমার থেকে বেশি। সে প্রায় দৌড়ে পৌঁছে গেল চার্চের কাছে। আমিও পা চালিয়ে তার কাছাকাছি এসে পৌঁছলাম। দেখলাম কৌশিক একটা ফলকের সামনে দাঁড়িয়ে। আরো কাছে যেতে বুঝলাম সে ওই ফলকে খোদাই করা লেখাগুলি নিজের ডায়েরিতে মন দিয়ে নথিবদ্ধ করছে। ফলকটি পড়ে যা বুঝলাম, চার্চটি সপ্তদশ শতকে নির্মিত। চার্চটির দেওয়াল পাথর গেঁথে তৈরি। বর্মী কাঠ দিয়ে জানলা, দরজা, কড়ি বর্গা নির্মিত ও নক্সা করা কাঁচ ও জানলার রঙিন কাঁচগুলি ইটালি থেকে এনে লাগানো হয়েছে। কৌশিক পুঙ্খানুপুঙ্খ লিখে নিচ্ছে ফলকের বয়ান। আমি ব্যাঙ্গাত্মক হাসি হেসে বললাম, “যা লিখছ তার কিন্তু কিছুই অবশিষ্ট নেই ভায়া। চেয়ে দেখো, শুধুই পাথর। নো কাঠ, নো কাঁচ।” কৌশিকও আমার কথা শুনে হেসে ফেলে বলল, “তা যা বলেছ বিপ্রদা। তবে এসব জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে খুব সাধ হয় সেই সময়টায় চলে যেতে। সেই প্রাচীন দিনগুলোকে চোখের সামনে দেখতে।” কথা শেষ করেই সে নিজের ডিজিটাল ক্যামেরায় পটাপট কিছু ছবি তুলে নিল। আর সঙ্গে সঙ্গে যেন প্রায় মাটি ফুঁড়ে একজন ভদ্রলোক রে রে করে তেড়ে এলেন। তার এমন হঠাৎ আগমনে আমরা দুজন একটু চমকেই গেছিলাম। কৈ কিছুক্ষন আগেও তো লোকটাকে ধারে কাছে কোথাও দেখলাম না। কৌশিক অবাক হয়ে বলল, “কি ব্যাপার বলুন তো?” ভদ্রলোক একইরকম অসন্তোষ নিয়ে বললেন, “ছবি তুলবেন না। ছবি তোলা বারণ।” আমি এদিক ওদিক দেখে বললাম, “কই সেরকম তো কোনো নোটিশ দেখছি না?” ভদ্রলোক যেন আরো রেগে গিয়ে বললেন, “লিখিত নোটিশ লাগবে? আপনারা জানেন না, কোনো প্রতিষ্ঠানেরই বিনা অনুমতিতে ছবি তোলা যায় না?” কৌশিক এবার আরেকটু চোটপাট দেখিয়ে বলল, “আপনি কে হে আপনার কাছে অনুমতি নিতে হবে?” লোকটি এবার গম্ভীর হয়ে বললেন, “আমি এখানকার ফাদার।” কৌশিক এবার আরো মেজাজ দেখিয়ে বলল, “ভাঙা চার্চের আবার ফাদার?” লোকটি এবার হাসলেন। আমরাও পূর্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালাম। হ্যাঁ। ফাদারের পোশাকই বটে। কিন্তু লোকটির মেজাজের সাথে তার কর্ম খাপ খায় না। লোকটি আবার হেসে বললেন, “তা বলতে পারেন। চার্চটি বহু বছরই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কিন্তু যতদিন ভগবান থাকেন, ততদিন ভক্তরাও থাকে। তাই যতদিন চার্চের ভেতর ঈশ্বর যীশুর ক্রুশবিদ্ধ মূর্তিখানি থাকবে ততদিন আমরাও থাকবো। কৌশিক উৎসাহী হয়ে বলল, “চার্চের ভেতর মূর্তি আছে বুঝি? সেই শতাব্দী প্রাচীন মূর্তি?” লোকটি হেসে মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ। এই দ্বীপে আরেকটিও ক্যাথলিক চার্চ আছে। এটি প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ। সেখানেও একটি মূর্তি আছে। পর্যটকরা কাছাকাছি এই চার্চটি দেখেই ফিরে যান। জঙ্গলের ভেতরে ঢুকতে চায় না।” কৌশিক প্রায় লাফিয়ে লোকটির সামনে এসে বলল, “যাবো। যাবো। আমরা যাবো। আপনি আমাদের নিয়ে যাবেন?” লোকটিও সমান উৎসাহ দেখিয়ে বলল, “নিশ্চই চলুন না।” আমি এবার একটু বিপদের গন্ধ পেলাম। কৌশিককে খোঁচা দিয়ে যথাসম্ভব ইশারায় বলার চেষ্টা করলাম, এসব জায়গা ভালো নয়। যদি কোনোপ্রকারে চোর ডাকাতের পাল্লায় পরে যাই তো বিদেশ বিভুঁইয়ে সর্বস্ব খোয়াবো। কিন্তু কৌশিক তখন কোনো কথা শোনার পর্যায়ে নেই। আমার হাত ধরে হিরহির করে টেনে নিয়ে গেল লোকটির পিছন পিছন।

জঙ্গল এখানে বেশ ঘন। উঁচু উঁচু পাইন, ইউক্যালিপ্টাস, নারকেল গাছ এবং আরো অনেক অজানা গাছের মাঝ দিয়ে সরু রাস্তা চলে গেছে। চারিদিকে আগাছার জঙ্গল। পা আটকে যাচ্ছে। ফাদার যতটা অবলীলায় হাঁটছেন আমরা পারছি না। যেতে যেতে শুনতে পেলাম ফাদার বলছেন, “আপনাদের সাথে তো পরিচয় পর্বটিই সারা হলো না। আমি এনড্রু নরেন মন্ডল। আমার ঠাকুরদাদা বাংলাদেশ থেকে সপরিবারে এই দ্বীপে এসে এই মিশনারিজদের কাছে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। তারপর থেকে আমরা সবাই এই ক্যাথলিক চার্চের অনুগত। সমুদ্রের ধারের চার্চটি অপেক্ষাকৃত নবীন। ক্যাথলিক চার্চটি অনেক পুরোনো। সেখানে ভগবানের মূর্তিটি সেসময়ের একটি নিদর্শন। ক্রুসের ওপর গাঁথা রয়েছে পাঁচটি বহুমূল্যবান পাথর।” আমি হোঁচট সামলে বললাম, “কিন্তু এত গভীর জঙ্গলে আপনারা কোথায় থাকেন?” নরেন বাবু হেসে বললেন, “ভগবানই স্থান জুগিয়ে দিয়েছেন।” ব্যাস তারপর সবাই চুপ। হেঁটেই চলেছি। কতক্ষন যে হেটেছি খেয়াল নেই। জঙ্গলের গভীরতার জন্যই হোক বা সন্ধ্যের আঁধারের জন্যই হোক চারিদিক দৃশ্যপটের বাইরে চলে গেছে। শুধু ফাদারের সাদা পোশাক টুকুই চোখে পড়ছে। সেটুকুই অনুসরণ করে চলেছি। কৌশিকের হাতটা আমার হাতের মধ্যেই ধরা ছিল। একটা চিমটি কেটে বললাম, “আর এগিয়ে লাভ নেই। ফিরে চলো। আমার কিন্তু এদের চালচলন বেগতিক ঠেকছে।” অন্ধকারে কৌশিকের অভিব্যক্তি দেখতে পেলাম না। তবে সেও বলল, “হ্যাঁ। আমারও খুব অস্বস্তি করছে। মনে হচ্ছে যেন কারা আমাদের এই গাছের আড়াল থেকে দেখছে। বুকের উপর খুব চাপ অনুভূত হচ্ছে।” কৌশিকের কথায় প্রমাদ গুণলাম। একে তো চোর ডাকাতের ভয়, তার উপর অসুস্থ অচেনা মানুষ নিয়ে নাকাল হতে হবে। বাঁহাতে কৌশিকের হাতটা ধরে রেখে, ডানহাতে ব্যাগ হাতড়ে টর্চটা বের করলাম। কিন্তু অনেকবার ঠোকাঠুকিতেও আলো জ্বলল না। আশ্চর্য কালই ব্যাটারি ভরলাম। তখন তো ভালোই জ্বলছিল। এদিকে আমাদের পা চলছে। অবাক হলাম এই ভেবে যে, যেখানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আমরা দুজন পরস্পরকে দেখতে পারছি না, সেখান থেকে পাঁচ হাত দূরে ফাদারের সাদা পোশাক কিভাবে নজরে আসছে। লোকটার চলন এতই সাবলীল যেন মনে হচ্ছে তিনি হাঁটছেন না, ভেসে যাচ্ছেন। সত্যি বলতে এবার ভয় করলো। জঙ্গলে কত কিছুই তো হয়। আরেকবার টর্চটা নিয়ে চেষ্টা শুরু করলাম। এবার একটা দৃশ্যে আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। কৌশিকের কথাই ঠিক। একটু দূরে একটা গাছের আড়ালে যেন দুটো বড় বড় লাল চোখ আমাদের দিকে নজর রাখছে। আমরা যত এগোচ্ছি চোখ দুটোও আমাদের আগে আগে চলছে। এক গাছের গুঁড়ি থেকে আরেক গাছের গুঁড়ির আড়ালে অবস্থান পাল্টাচ্ছে। গলাটা শুকিয়ে এলো। তবু হাঁক ছাড়লাম, ফাদার আর কতো দূর। কোনো উত্তর এলো না। এবার আমরা থমকালাম। আর আমাদের দাঁড়ানোর সাথে সাথে ফাদারের অবয়বটিও থেমে গেল। আশ্চর্যজনকভাবে টর্চটা চারিদিক আলো করে জ্বলে উঠল। আমি সামনের দিকে আলো ফেলতেই হাড় হিম হয়ে গেল। একি! সামনে তো কেউ নেই। একেবারে ফাঁকা। চারিদিকে আলো ফেললাম, ঘন জঙ্গল। কোথায় সেই লাল চোখ? হঠাৎ কৌশিকের আর্তনাদে পিছন ফিরে দেখি সে দরদর করে ঘামছে। আর দুহাত দূরে পরে আছে একটা করোটি। এল ফেলে দেখলাম এরকম আরো কঙ্কাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে চারিদিকে। আমরা যেদিক দিয়ে এসেছিলাম সেদিকে ছুট লাগালাম। কিন্তু এতক্ষন অন্ধকারে পেরিয়ে আসা পথ আলোয় চিনতে পারছি না। ঠিক করলাম সমুদ্রের শব্দ অনুসরণ করবো। সেই মতোই ছুটে চলেছি প্রাণপন। একটি বাঁকে কৌশিক থমকে দাঁড়ালো । সামনে দাঁড়িয়ে ফাদার এনড্রু নরেন মন্ডল। আমাদের দিকে তাকিয়ে মিচকি মিচকি হাসছেন। সেই হাসিতে একটা পৈশাচিক আনন্দ আছে। কৌশিক যেন কেমন দুর্বল হয়ে পারচর মনে হলো। ওকে একটা হ্যাঁচকা টানে সোজা করে আবার ছুট লাগালাম।এরপর থেকে যেন ফাদারের প্রেতাত্মা আমাদের পিছু নিল। প্রত্যেকটা বাঁকেই তিনি তার পৈশাচিক হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে। একটা সময় জঙ্গল শেষ হয়ে এলো। আমরা আবার এসে পৌঁছলাম সেই ভাঙা চার্চের কাছে। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার তবু তার মধ্যেও যেন মনে হলো ওই চার্চের কাছে সারিবদ্ধ কালো কালো অবয়ব নিশ্চল দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের চোখ ভাটার মতো জ্বলছে।

আমরা এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে চড়াই উঠতে শুরু করলাম। একে এতখানি জঙ্গল পেরিয়ে এসে হাঁফ ধরে গেছিল। তারপর এই চড়াই ওঠা আরো মুশকিল হয়ে পড়ল। বেশ কিছুটা ওঠার পর মনে হলো যেন ঝড় শুরু হয়েছে। সমুদ্রের দিক থেকে আসছে হাওয়াটা। এদিকে সামনের গাছগুলো নিস্পন্দ। আমরা প্রানপন এগিয়ে চলেছি। হঠাৎ মনে হলো যেন ওই হাওয়া আমাদের প্রায় উড়িয়ে নিয়ে চলেছে। তারপর দুম করে দুজনকে মাটিতে আছড়ে ফেলল। তারপর আমাদের আর কিছুই মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরল তখন সূর্য মাথার ওপর উঠে গেছে। আমাদের অনেকগুলি মানুষ ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের মধ্যে বিষ্ণু এবং সেই দোকানিও ছিল। কৌশিকের হাতটা ভেঙে গেছিল। মোটামুটি শুশ্রূষা করে ও আমাদের চা জল খাইয়ে ওরা এই বলে আশ্বস্ত করল যে প্রাণে বেঁচেছি এই অনেক। হাত তো পরেও জুড়ে যাবে। আমরা সেদিনই পোর্টব্লেয়ার রওনা দিই। কৌশিকের সাথে মাঝে মধ্যে কথা হয়। আর বারবার ফিরে আসে ওই রাতের ঘটনা।

বিপ্রদাস বাবু থামলেন। তিন মূর্তি চুপ করে বসে আছে। শুধু পাশের বাঙ্কের ভদ্রমহিলার নাক ডাকার শব্দ আর ট্রেনের একটানা ঘরঘর আওয়াজ। অবিনাশ প্রথম মুখ খুলল, “তাহলে ভূত আছে বলুন?” বিপ্রদাস মাথা নাড়লেন, “তা আছে বটে। তবে নার্ভ শক্ত রাখলে কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।” সত্য বলল, “আপনার নার্ভ তো বেশ স্ট্রং। আর আপনার তাহলে ভূত দেখার ক্ষমতাও আছে!” বিপ্রদাস হেসে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই বিকাশ বাঁকা হেসে বলল, “ওঁর ভূত দেখার ক্ষমতা না থাকলে কি আমাদের দেখতে পেতেন?” বিকাশের কথাটা শেষ হতেই অবিনাশ আর সত্যের ঠোঁটে একটা অন্যরকম হাসি ফুটে উঠল। চোখের তারাদুটো চিকচিক করে উঠল। বিপ্রদাস বাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “মানে?” সঙ্গে সঙ্গে তার চোখে সামনে তিনটি যুবক অদৃশ্য হয়ে গেল। বিপ্রদাস কিছুক্ষন স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন, তারপর ….. মূর্চ্ছা গেলেন।
সমাপ্ত।

Saturday, September 7, 2019

Historia amor invisible

by on September 07, 2019



সাইকেলের ক্রিং ক্রিং শব্দ শুনতেই দৌঁড়ে বাড়ির সদর দরজা খুলে দেয় ফাল্গুনী। তাকিয়ে দেখে সাদা পায়জামা আর বাদামি রঙের ফতুয়া পরহিত যুবক মাস্টারমশাই দাঁড়িয়ে আছেন।
‘ভেতরে আসুন।’
ফাল্গুনীর কথায় সম্মতি জানিয়ে ফাল্গুনীর পেছন পেছন বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন তাপস দাস।
এ বাড়িতে আজ তার প্রথম আসা। পাড়ার স্কুলটাতে কয়েক দিন হলো যোগদান করলেন। পাশের গ্রামেই তার বাড়ি৷ ফাল্গুনীকে পড়ানোর জন্য এখন থেকে তার এ বাড়িতেই আসা যাওয়া হবে রোজ। এমনটাই জানিয়েছেন ফাল্গুনীর বাবা নারায়ণ মুখার্জি।
গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবার হলেন নারায়ণ মুখার্জির পরিবার। তার শাসনেই চলে এ গ্রামের সকল কার্যক্রম। গ্রামের মানুষের প্রতি তার দয়া থাকলেও, নিজের সম্মানের প্রতি তিনি যথেষ্ট সতর্ক। সে বিষয়ে ছাড় দেন না কাউকে।
তাপস দাস ইতস্ততা অনুভব করছেন। দখিণ দিকের জানালা খোলা বাতাসও আসছে বেশ, তারপরেও বেশ ঘেমে চলছেন। ফাল্গুনী হাত পাখাটা হাতে নিয়ে বাতাস করতে লাগলে তাপস দাস আরও বেশি বিব্রতবোধ করলেন। হাত পাখাটা চেয়ে নিয়ে নিজেই বাতাস করতে লাগলেন।
‘আপনাকে কি মাস্টার বাবু ডাকবো?’
‘না! না! আমাকে তাপস দা ডাকলেই চলবে।’
মুচকি হেসে জবাব দিলো ফাল্গুনী, ‘আচ্ছা তাপস দা। কি পড়াবেন আজ তাহলে?’
‘তোমার কোন বই পড়তে ভালো লাগে?’
‘আমার তো রবীন্দ্রনাথ পড়তে ভালো লাগে।’
‘আর পাঠ্য বই?’
‘ওসবে আমায় তেমন টানে না। বাবার জোরেই পড়া লেখাটা চলছে।’
‘তোমার কোনো স্বপ্ন নেই?’
‘রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের নায়িকা হতে ইচ্ছে করে।’
‘আর?’
‘আর কোনো স্বপ্ন নেই।’
‘আজ তাহলে ইংরেজি দিয়ে শুরু হোক?’
‘আপনি বুঝি ইংরেজি পড়তে বেশি ভালো বাসেন?’
‘বাংলা, গনিতেও আমার যথেষ্ট জ্ঞান আছে। তবে ইংরেজিটা বেশি টানে।’
‘বৈশাখিও বলেছে আপনি স্কুলে কথায় কথায় ইংরেজি বলেন।’
‘ঠিক অতটা নয়। যতটা যাকে শেখানো প্রয়োজন ততটাই বলি।’
প্রতিদিন দুপুর বেলায় তাপস এ বাড়িতে আসে। ঘন্টা দেড়েক পড়িয়ে সাইকেল নিয়ে বাড়ি ফেরে। নারায়ণ মুখার্জি যদিও তাপসকে এ বাড়িতে থেকেই স্কুলে যাতায়াত করতে বলেছিলেন। কিন্তু তাপসই রাজি হয় নি৷ স্কুল থেকে ফিরে মায়ের মুখ খানা আর স্কুলে আসার আগে মায়ের মুখ খানা না দেখলে তার ভালো লাগে না।
বৈশাখি আর ফাল্গুনী উঠানের পেয়ারা গাছটা থেকে পেয়ারা পেড়ে খাচ্ছে ঠিক এমন সময় তাপস বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো। আজ আর সাইকেল আনে নি। হেঁটেই এসেছে।
বেশ তাড়াহুড়ো করেই পড়তে বসে গেলো ফাল্গুনী।
‘আজ সাইকেল আনেন নি কেন?’
‘গ্রামটা সুন্দর হেঁটে আসতেই ইচ্ছে হলো। তাই ভাবলাম….’
‘ওহ্! আচ্ছা আপনি কি কোলকাতায় পড়াশোনা করেছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘কোলকাতায় থেকে গেলেই পারতেন।’
‘নিজের আপন ভূমি ছেড়ে ওখানে খুব বেশি একটা শান্তি মেলে না।’
‘আমারতো বেশ লাগে।’
‘ওহ্’
প্রতিদিন কোনো না কোনো বিষয়ে কথোপকথনের পরই শুরু হয় পড়া লেখা। আস্তে আস্তে ফাল্গুনীও জানতে থাকে অজানা অনেক কথা। এবার শিখতে থাকে পাঠ্য বইয়ের পাতা।
ষোল বছরের ফাল্গুনীর শরীর জুড়ে কমতি নেই কোনো সৌন্দর্যের। কেবল মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে ষোড়শীর সৌন্দর্যের পানে। এই সৌন্দর্যের মোহে পড়েছে কত যুবক তার হিসেব নেই। তবে এখন আর কোনো যুবকের নজরে পড়লেও দীর্ঘস্থায়ী হয় না সে মোহ। চৌদ্দতে তার বিয়ে ঠিক হলো এক নাম করা ধনী ব্রাহ্মণ পরিবারের শিক্ষিত ছেলের সঙ্গে। বেশ সুদর্শন যুবক। দুই পরিবারের লোকজন মিলে বেশ আয়োজন করে ঢাকঢোল পিটিয়ে দাওয়াত দেয় বিশিষ্ট লোকজনদের।
কনে সেজে বসে আছে ফাল্গুনী। লজ্জায় তার সারা মুখ লাল হয়ে আছে। খিদে লাগলেও সে খিদে টের পায় না অপেক্ষায়। বিয়ের লগ্ন পেরিয়ে গেলো কিন্তু বর এলো না। এক সময় খবর এলো এ বিয়ে আর হচ্ছে না। ছেলে তার পছন্দের মেয়ের কাছে কলকাতায় চলে গেছে।
বিয়ে ভাঙ্গে ফাল্গুনীর, মন ভাঙ্গে বাড়ির সকলের। কয়েকদিন মন মরা হয়ে পড়ে থাকে বাড়ির এখানে ওখানে। তারপর নিজেই আবিষ্কার করে নিজেকে। ইচ্ছে জাগে ভালোবাসা জিনিসটাকে ছুঁয়ে দেখতে৷ কেমন হয় সে অনুভূতি, বেশ আগ্রহ হয় তার জানতে। যে ভালোবাসার টানে তার মত সুন্দরী মেয়েকে কেউ প্রত্যাখ্যান করে, সে ভালোবাসার টানটা একবার দেখার বেজায় স্বপ্ন জাগে মনে।
বাবাকে বলে পড়াশোনাটা শুরু করে। যদিও তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ নেই৷ সারাদিন সময় কাটানোর জন্য হলেও তো একটা ব্যস্ততা চাই। আর নারায়ণ মুখার্জিও এখন চান তার মেয়ে বড় কেউ হোক, নিজেই অর্জন করুক একলা চলার ক্ষমতা।
কয়েক দিনের ছুটি নিয়েছিলো তাপস। শহরের কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরলো সকালে। তারপর ফাল্গুনীর বাড়িতে ঠিক দুপুরের ঠিক সময়ে হাজির হয় তাপস। হাতে একটা রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস।
ফাল্গুনী জিজ্ঞেস করলো, ‘হঠাৎ রবীন্দ্রনাথ কেন তাপস দা?’
‘শহর থেকে নিয়ে এসেছি। তুমি তো রবীন্দ্রনাথ পড়তে ভালোবাসো।’
‘শেষের কবিতা। বাহ্! এই উপন্যাসটা আমার কাছে ছিলো না। আপনি বুঝলেন কি করে এটাই আমার দরকার?’
‘মনে হয়েছিলো, এটা নিলে ঠিক হবে।’
বইটা পেয়ে বেশ খুশি হয় ফাল্গুনী। মুগ্ধ হয়ে পড়তে থাকে বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠা। নিজেকে লাবণ্য মনে হতে লাগলো। অমিতের চরিত্রে না চাইতেও বারবার তাপস চলে আসে।
যত পড়ে তত অনুভবে ভেসে যায় তাপসকে নিয়ে। বই ছেড়ে উঠে পড়ে। ছাদের পশ্চিম কোণ ঘেঁষে শিউলি গাছ। বেলি গাছের লতাগুলোও বেয়ে উঠেছে ছাদে। কয়েকটা ফুল তুলে খোপাঁয় গুঁজে দেয়। তারপর গুনগুন করে গান গাইতে থাকে,
“মায়াবনো বিহারিণী হরিণী,
গহনো স্বপনো সঞ্চারিনি।
কেন তারে ধ’রি/বারে ক’রি
পন অকারণ…….”
ইদানীং দুপুর হতে যেন একটু বেশি সময় লাগে ফাল্গুনীর কাছে। ছাদে উঠে দাঁড়িয়ে রাস্তায় চোখ বুলায় কয়েকবার। তাপস এসেছে কিনা দেখার জন্য ছটফট করতে থাকে ফাল্গুনীর ভেতরটা৷
যখনই সাইকেলের ক্রিং ক্রিং শব্দ আসে, তখনই আনন্দে লাফিয়ে উঠে ফাল্গুনী। এই অনুভূতির নাম কি তার জানা নেই।
তাপসের পরিবার বলতে তাপসের মা আর ছোট বোন তৃণা দাস। ছোট বোনকে নিয়ে তার স্বপ্নের অন্ত নেই। সমাজের যে যাই বলুক না কেন বোনকে সে ডাক্তার বানাবে, এমনটাই পণ করেছে৷ তৃণারও লেখা পড়ায় ঢের আগ্রহ। পড়াশোনা ছাড়া তার কোনো জগৎ নেই বললেও চলে।
ফাল্গুনীর বড় বোনের বিয়ে হয়েছে কলকাতায়। বোনের বর পেশায় কলেজের অধ্যাপক। বেশ সুখেই আছেন তারা। ছেলে নেই বলে নারায়ণ মুখার্জির দুঃখবোধ না থাকলেও ফাল্গুনীর মায়ের যেন দুঃখ ঘোচেই না। তাপসকে তাই সে ভীষণ আদর করে। প্রায়ই যত্ন করে নিজ হাতে বেড়ে খাওয়ান। ফাল্গুনীর ছোট মাসি এ বাড়িতেই থাকেন। তাপসকে তিনি ভীষণ স্নেহ করেন। নিচু জাত বলে অবহেলা করেন না কখনও তারা।
তাপসের সারা মুখ জুড়ে মায়া। এই মায়াটাই সবাইকে বেশ টানে। তাছাড়া দেখতে শুনতেও কম নয়। তাপসের মা বলেন রাজপুত্তুর। রাজপ্রাসাদ না থাকলেও যা আছে তাতেই খুশি তাপস।
‘আপনি ইদানীং দেরি করে আসেন কেন?’
‘আমি তো যথা সময়েই উপস্থিত হই।’
‘এবার থেকে একটু তাড়াতাড়ি আসবেন।’
‘আচ্ছা আসবো।’
বইয়ের দিকে মনোযোগ নেই ফাল্গুনীর। পুরো মনোযোগ পড়ে আছে তাপসের পাণে। ইদানীং এই পরিবর্তনগুলো বেশ চোখে পড়ছে তাপসের। বুঝে উঠতে পারে না আসল ঘটনা।
‘কারো জন্য যদি সারা রাত ঘুম না হয়, বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে থাকে, সারাদিন আনমনে এটা ওটা ভাবতে থাকে, খাওয়ারও ইচ্ছে করেনা তাহলে তাকে কি বলা হয় তাপস দা বলতে পারেন?’
তাপস চুপ করে থাকে।
খানিক বাদে বলে ওঠে, ‘উপন্যাসেই এসব লেখা থাকে।’
‘যদি উপন্যাসের গন্ডি পেরিয়ে, সে ছটফটানি চলে আসে বাস্তবতায় তখন?’
‘ভেবে চিন্তে নিজেকেই জানতে হয়। নিজেকে নিজের থেকে কেউ ভালো বোঝে না।’
‘কিভাবে জানতে হয় বলবেন তাপস দা?’
‘সংশয় ঘুচাতে কখনও কখনও বিষয়ের কাছাকাছি পৌঁছেতে হয়। তবেই তো রহস্য উন্মোচন হয়।’
পড়ানো শেষ করে তাপস চলে যায়। চেয়ারেই বসে থাকে ফাল্গুনী। ভেবে পায় না কি করে পৌঁছাবে কাছাকাছি।
‘বাবা কিছু বলার ছিলো।’
মেয়ের শুকনে মুখটা দেখে মায়া হয় নারায়ণ মুখার্জির।
‘আয় মা, বোস এখানটায়। বল কি বলবি।’
‘পড়াশোনার চাপটা একটু বেশি যাচ্ছে। তুমি যদি তাপস দা’কে বলতে কয়েকটা দিন আমাদের বাড়িতে থাকতে।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। আমি ব্যবস্থা করছি।’
বাবার আশ্বাসে খুশি হয় ফাল্গুনী। কয়েকদিনের মধ্যেই তাপস এবাড়িতে ক্ষনস্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেলো। ফাল্গুনীর চোখে খেলা করছে অজানা এক অনুভূতি। এই রহস্য তাকে বের করতেই হবে।
সন্ধ্যা বেলায় হঠাৎ ঝড় শুরু হয়েছে। বাড়ির ভেতরের সব আলো নিভে যায় যায় অবস্থা। পর্দার কাপড় উড়িয়ে জানালা দিয়ে বেশ দমকা বাতাসের প্রবেশ শুরু হয়। জানালাগুলো আটকাতে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফাল্গুনী দৌড়ে আসে নিচে। দ্বিতল বাড়ির নিচ তলায় বেশ কয়েকটা কক্ষ। পূব পাশের কক্ষটাতেই তাপসের বসবাস। বাকি কক্ষের জানালাগুলো আটকানো শেষে পা বাড়ায় তাপসের কক্ষের দিকে। ঠিক তখনই তাপসের ঘর থেকে আচমকা এক দমকা বাতাস এসে নিভিয়ে দেয় হাতে থাকা মোমবাতিটা৷ বাহিরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। অনুমান অনুযায়ী পা বাড়াচ্ছে ফাল্গুনী। হঠাৎ ধাক্কা লাগে একটা শরীরের সঙ্গে।
তাপস ‘কে’, বলে চেচিয়ে উঠতেই ফাল্গুনী বললো, ‘আমি ফাল্গু।’
বাড়িতে সকলে ফাল্গু বলেই ডাকে ফাল্গুনীকে।
দিয়াশলাই খুঁজে মোমবাতিটা জ্বালায় তাপস। মোমবাতিটা এগিয়ে ধরতেই তাপসের চোখে পড়ে সৌন্দর্য গড়িয়ে পড়া ফাল্গুনীর মুখখানা। লালচে আলোয় সে সৌন্দর্য দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে।
মোম বাতিটা ফাল্গুনীর হাতে দেয় তাপস। তারপর নিজের মোমবাতি খুঁজতে গিয়ে দেখে একটা মোমবাতিও নেই। মুখোমুখি বসে আছে দু’জন। মোমবাতিটা টেবিলের উপর রাখতে যাবে এমন সময় গর্জিয়ে এক বিদ্যুৎ চমকে উঠলো।
ফাল্গুনীর হাত থেকে মোমবাতিটা ফ্লোরে পড়ে নিভে গেলো। তোড়জোড় করে আবারও এক গর্জন। শক্ত করে চেপে ধরলো পাশে থাকা তাপসের হাতটা।
তাপস ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে না। হঠাৎ হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানো আলো জানালার ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করছে। সে আলোয় ফাল্গুনীর ভয় পাওয়া মুখটা আবছা দেখা যাচ্ছে। মায়া জন্মাতে লাগলো তাপসের।
বৃষ্টি কমলে হাতটা ছেড়ে দেয় ফাল্গুনী। তাপসকে নিজের ঘর থেকে কয়েকটা নতুন মোমবাতি দিয়ে পাঠায় বৈশাখির কাছে। রাতের খাবার শেষে আজ আর ফাল্গুনীর ঘুমই আসে না। বারবার তাপসের হাত ধরে বসে থাকার কথা মনে পড়তে থাকে। লজ্জায় পরেরদিন এড়িয়ে চলে তাপসকে।
ফাল্গুনী ভীষণ ভালো রবীন্দ্র সংগীত গায়। প্রায় ভোরেই হারমোনিয়ামে সুর তোলে, গলা ছেড়ে গান গায়। ছাদে হাঁটতে হাঁটতেও গুনগুন করে গান গায়। ইদানীং একটু বেশি বেশিই গানে মনোযোগ দেয় ফাল্গুনী। প্রায় গেয়ে ওঠে,
‘আমারও পরানে যাহা চায়,
তুমি তাই-
তুমি তাই গো…..’
এই কয়েকদিনেই তাপসও টের পায় ফাল্গুনীর প্রতি তার বিশেষ টানটা। কিন্তু নারায়ণ মুখার্জির কথা মনে পড়তেই ভুলে যায় সব। নিজের জাত রেখে অন্য জাতের সাথে ভালোবেসে ঘর ছেড়েছিলো তার ছোট বোন। সেই থেকে তিনি তাঁর ছোট বোনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
ফাল্গুনীর ছোট মাসিও ভালোবাসতেন অন্য জাতের এক ছেলেকে। নারায়ণ মুখার্জির কানে খবর এলে গ্রাম থেকে বের করে দেন সপরিবারে তাদেরকে। গ্রাম ছেড়ে চলে যায় ছোট মাসির ভালোবাসার মানুষ। নারায়ণ মুখার্জির কড়া নির্দেশ অমান্য করার সাহস তার হয় নি। ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করতে না পারার শোকে আর কখনও বিয়ে করেন নি তিনি।
সবাইকে বলে কয়ে এবার বাড়ির দিকে যাওয়ার অনুমতি চায় তাপস। সবাই অমত করলেও একসময় রাজি হয়।
‘তাপস দা আপনি আরও কয়েকদিন আমাদের বাড়িতে থাকুন না দয়া করে।’
ফাল্গুনীর কথাটা রাখতে গেলে ভেতরে আরও মায়া জন্মে যাওয়ার ভয় থাকে। তার থেকে দিনে দেড় ঘন্টা বরাদ্দ থাকাই ঢের ভালো।
ফাল্গুনীর মুখ মলিনতায় ছেয়ে যায়। দুপুরের এই দেড় ঘন্টা তার জন্য খুব নগন্য মনে হতে থাকে। ভেতরের যন্ত্রণার কথা একসময় জানায় ছোট মাসিকে।
মাসি ভীত স্বরে বলে, ‘সর্বনাশ করেছিস ফাল্গু! তুই তো ভালোবেসে ফেলেছিস তাপস কে।’
ফাল্গুনী অবাক চোখে চেয়ে থাকে। তাঁর অবিশ্বাস্য লাগে, সে কাউকে ভালোবেসেছে। মুখ জুড়ে আনন্দের হাসি ফোটে।
ছোট মাসি ধাক্কা দেয় ফাল্গুনীকে, ‘ওই ফাল্গু! হাসছিস কেনো? খবরদার তুই কিন্তু মনের ভুলেও এই কথা মুখে উচ্চারণ করিস না। জামাইবাবু শুনলে খবর করে ছাড়বে তাপসের।’
ফাল্গুনী পাত্তা দেয় না সে কথা।
হেসে উঠে বলে, ‘মাসি! সত্যিই এটাকেই ভালোবাসা বলে? এই জন্যই মানুষ ঘর ছাড়ে, পালায় বিয়ের আসর থেকে, উপেক্ষা করে সব আর অপেক্ষাও করে তোমারই মত!’
ছোট মাসি চুপ করে থাকে। ভেতরে ভেতরে সে এখনও অপেক্ষা করে তার ভালোবাসার মানুষের জন্য। সাহসের অভাবেই চাপা দেয় সব অনুভূতি। লুকিয়ে রাখে ভেতরটাতে সব মায়া, যন্ত্রণা আর ভালোবাসা ।
তাপসকে ভালেবাসার কথা বলার সাহস নেই ফাল্গুনীর। ভয় হয়, তার মত তাপসও যদি অন্য কাউকে মন দিয়ে বসে থাকে তখন কি হবে!
কিংবা তাপস যদি তার মত বিয়ে ভাঙ্গা মেয়েকে ভালোবাসতে না চায়!
এমন অনেক প্রশ্ন ভীড় জমায় মস্তিষ্কে। কিন্তু দিনদিন অস্থিরতা বেড়ে চলছে এতে। অনেক ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে চিঠি লিখতে বসে যায়।
আজ যেন দুপুর হচ্ছেই না।
পড়া শেষে তাপসের আনা বইয়ের মাঝে চিঠিটা পুরে দেয় গোপনে।
বাড়ি ফিরে সন্ধ্যায় বই খুলতেই তাপসের চোখে পড়ে চিরকুট। আবেগ আর মায়া জড়িয়ে ভালোবাসা ঢেলে লেখা এই চিরকুট’টা তাপসের হৃদয়ে স্থান পেলেও প্রকাশ করে নি তাপস সে কথা। এক ঝামেলার পরে নতুন করে আরও একটা ঝামেলা আনতে চায় না ফাল্গুনীর জীবনে।
পরদিন পড়াতে গেলে তাপস এমন ভাব দেখায় যেন সে কোনো চিরকুটই পায় নি। ফাল্গুনী বুঝে উঠতে পারে না ঘটনা৷ বারবার ভাবতে থাকে চিরকুট তো ঠিকমতোই দিয়েছিলো বইয়ের ফাঁকে।
পরদিন আবার চিরকুট লেখে ফাল্গুনী। কিন্তু প্রত্যুত্তরে মেলে না কিছুই। টানা সতেরো দিন চিরকুট লিখে যায় সে। একসময় বুঝতে পারে ইচ্ছে করেই অগ্রাহ্য করছে তাপস।
বাড়ির সকলে আজ নিমন্ত্রণে গেছে। বাড়িতে কেবল ফাল্গুনী একা। বিকেলেই ফিরবে সকলে। নানা অজুহাত দেখিয়ে রয়ে যায় ফাল্গুনী।
তাপস এসে বসতেই জিজ্ঞেস করলো, ‘বাড়ির সকলে কেথায়?’
‘নিমন্ত্রণে গেছেন। বিকেলে চলে আসবে।’
‘আজ তা হলে আমি আসি। কাল এসে বেশি সময় পড়িয়ে যাবো।’
বলেই উঠে দাঁড়ায় তাপস। ফাল্গুনী হনহন করে দরজার সিটকানি লাগিয়ে তাপসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘চিঠির উত্তর দেন নি কেনো?’
তাপস চুপ করে থাকে।
‘আমার বিয়ে ভেঙ্গেছে বলে বিয়ে করা যাবে না নাকি অন্য কাউকে আপনি ভালোবাসেন?’
‘এমন কিছুই না।’
‘তবে কি সেটা আমি জানতে চাই।’
তাপস চোখ তুলে তাকায়। রাগত্ব স্বরে জবাব দেয়, ‘আমাদের জাত আলাদা। তোমার সাথে আমার মেলে না। মেলানো সম্ভব নয়। এসব কথা তুমি ভুলে যাও। আর কখনও চিঠি লিখবে না।’
বলেই চলে যেতে চায় তাপস। আচমকা সেদিনের ঝড়ের রাত্রিরের মত আবার শক্ত করে তাপসের হাতটা ধরে বসে ফাল্গুনী।
‘আপনি কি আমায় ভালোবাসেন না?’
তাপস চুপ থাকে।
ফাল্গুনীর চোখ বেয়ে জল নামে।
আকুতি করে আবার জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কি সত্যিই আমায় ভালেবাসেন না?’
তাপস এবার আর নিজেকে আটকাতে পারেনা। দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে ফাল্গুনীর চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়, ‘আমি ভালোবাসি।’
ডুকরে কেঁদে উঠে ফাল্গুনী।
‘আমাকে নিয়ে চলুন এখান থেকে। আমি মুক্তি চাই এই জাতে জাতে পার্থক্য থেকে।’
‘লাবণ্য পায় নি অমিতকে, তুমিও পাবে না আমায়। বিরহেও ভালেবাসা বেঁচে থাকে। থাকুক এভাবে।’ বলেই হন্তদন্ত হয়ে চলে যায় তাপস।
চিৎকার করে কেঁদে ওঠে ফাল্গুনী।
এখন আর আসে না তাপস এ বাড়ি। গুনগুন করে গান গেয়ে উঠে না ফাল্গুনী। রাতে বালিশ ভেজায়, দিন হলে স্পষ্ট হয় চোখের নিচের কালো দাগটা।
‘মাসি তুমি চলে গেলে না কেন তার সঙ্গে?’
‘যেতে চেয়েছিলুম রে ভেতরে, বাহিরে সাহস করে কুলোতে পারলাম না৷ এমন পুড়ে মরতে হবে জানলে সেদিন রাতেই চলে যেতাম।’
‘কোন রাতে?’
‘যে রাতে সিঁদুর পরানোর কথা ছিলো।’
বলতেই ভেতরটা মোচড় দেয় তার। চুপ করে থাকে।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ফাল্গুনী।
বৈশাখিকে দিয়ে জরুরি খবর পাঠায় তাপসের কাছে। ফাল্গুনী খুব ভালো করেই জানে তাপস আসবে।
বাড়ির সকলে ফাল্গুনীর বড় পিসির বাড়ি গিয়েছে নিমন্ত্রণে। আজও রয়ে গেলো ফাল্গুনী একাই। রাতেই ফেরার কথা সবার।
ঘোর অন্ধকারে বাহির ছেয়ে আছে। আকাশও বেজায় মেঘলা। ভাপসা গরম পড়েছে দুপুর থেকে। তাপস এসে দরজার কড়া নাড়তেই দরজা খোলে ফাল্গুনী।
লাল শাড়ী পড়েছে সে, দু’হাতে লাল রেশমী চুড়ি, আলতা দিয়েছে সুন্দর করে, কালো দীঘল চুলগুলো খোলাই রইলো।
চোখ ফিরিয়ে নিয়ে তাপস জিজ্ঞেস করে, ‘সকলে কোথায়?’
উত্তর দেয় না ফাল্গুনী।
তাপসের হাতে সিঁদুরের কৌটা ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘পড়িয়ে দাও। সংসার না হোক, একসঙ্গে থাকা না হোক, একটা শক্ত স্বীকৃতি থাকুক। আমি আমার ভালোবাসার শক্ত স্মৃতি চাই।’
তাপস উপেক্ষা করে চলে যেতে চাইলো। বাহিরে মেঘ গর্জন করে উঠলো। পথ আটকালো ফাল্গুনী। বৃষ্টি নামলো ঝমঝমিয়ে। আজ রাতে আর এ বৃষ্টি থামবে বলে মনে হয় না।
জানালাগুলো সব খোলা। জানালা দিয়ে এক পশলা বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিলো জানালার এপাশ। হঠাৎ আবার গর্জন করে মেঘ ডাকলো সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকানো। জাপটে ধরলো তাপসকে ফাল্গুনী। ছাড়িয়ে নেওয়া অসম্ভব তাকে। তাপস বুকের মাঝেই আগলে রাখলো ফাল্গুনীকে। তাপসের বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দনের মাত্রা বাড়তে লাগলো। ফাল্গুনী আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো।
‘তাপস দা?’
‘বলো’
‘এই রাত্রিরটা তোমার আমার জন্যই। ঈশ্বর চাইছেন বলেই আজ বরষা নামলো। আমায় ফিরিয়ে দিও না তুমি৷ সেদিন মোমবাতিটা পড়ে গিয়েছিলো, সিঁদুরের কৌটা’টা কিন্তু হাতেই আছে দেখো। তাপস দা আমি তোমার কাছে কেবলই স্বীকৃতি চাই। আমায় হতাশায় ডুবিও না।’
গড়গড় করে পানি ঝরছে চোখ থেকে। তাপসের চোখ ছলছলিয়ে উঠলো। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে। এ বৃষ্টিতে কেউ ফিরতে পারবে বলে মনে হয় না। সিঁদুরের কৌটা’টা হাতে নিয়ে পরিয়ে দিলো খোলা চুলের সিঁথিতে।
জাপটে ধরলো ফাল্গুনী তাপসকে।
চোখের জল আলতায় মিশলো, আলতা রাঙা হাত থেকে গড়াচ্ছে রাঙা ফোটা।
তারপর ঘোর অন্ধকার। মোমবাতি ফুরিয়ে নিভে গেলো। সে অন্ধকারে মিশে গেলো তারা দু’জন। মনের ভালোবাসা এবার শরীর জুড়ে উথলে উঠছে।
স্বীকৃতির সঙ্গে চিহ্ন জন্মাচ্ছে ভালোবাসার। স্মৃতিতে লেগে থাকবে এ ভালোবাসার গভীরতা। ভালো থাকার পুরোপুরি অধিকার আছে এখন দু’জনের।
আজ আর ভয় নেই যেনো কোনো কিছুতে। ভালোবাসা আটকে রাখার জিনিস নয়। ভালোবাসার স্থান মনে, মন সে তো ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। অদৃশ্য এই ভালোবাসাকে জাতে আঁটকাবে কি করে!

Pages

Featured post

গল্প -সহযাত্রী

  ট্রেনটা চলতে চলতে থেমে গেল একটা ক্যাঁচ শব্দ তুলে। বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির কারণে বা লাইন বদলের দরুন থেমে গেছে দূরপাল্লার একটা ট্...